যেদিন চলে গেলেন বিদ্রোহী কবি নজরুল

শিল্প ও সাহিত্য

বার্তা ডেস্ক.
সাহিত্য জীবনের পুরোটাজুড়েই উপহার দিয়ে গিয়েছেন প্রতিবাদী ও বিপ্লবীধারার সাহিত্যকর্ম। সমাজ-সচেতন ও সংগ্রামী এক কবি ও লেখক ছিলেন তিনি। তাই ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে তাকে আখ্যা দিয়েছে দেশের মানুষ। কিন্তু সংগ্রাম ও বিদ্রোহ করতে করতে যেন ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। দূরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৪২ বছর বয়সে হারান বাক ও স্মৃতিশক্তি। জীবনের বাকি ৩৪টি বছরও যেন সংগ্রাম করে বেঁচে ছিলেন এই দুরারোগ্য ব্যাধির সাথে। অতঃপর ১৯৭৬ সালের ২৭ আগস্ট জীবনের লড়াই-সংগ্রাম থেকে অবসর নিয়ে পাড়ি জমান চির-প্রশান্তির দেশে। আজ তাঁর ৪৩তম মহাপ্রয়াণ দিবস।
বাংলাদেশের মানুষ অনেক সৌভাগ্যবান যে জীবনের শেষ কটি দিন কবি কাটিয়েছেন এদেশের মানুষের সাথে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের ২৪ মে ভারত সরকারের অনুমতিক্রমে কবি নজরুলকে সপরিবারে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক্ষেত্রে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কবির বাকি জীবন বাংলাদেশেই কাটে। ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে নজরুলকে স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদানের সরকারি আদেশ জারী করা হয়।
তাঁর মহাপ্রয়াণ:
বাংলাদেশে নিয়ে আসার পর অসুস্থ কবির চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবায় কোনো কমতি রাখেনি বাংলাদেশ সরকার। কিন্তু তারপরও, বিশেষ কোনো উন্নতি হয়নি নজরুলের স্বাস্থ্যের। ১৯৭৪ খ্রিঃ মারা যান কবির সবচেয়ে ছোট ছেলে এবং বিখ্যাত গিটারবাদক কাজী অনিরুদ্ধ ইসলাম। ওই বছরেই আগস্ট মাসে কবির স্বাস্থ্যের অবনতি। ২৭ আগস্ট শুক্রবার বিকেল থেকে কবির শরীরে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ব্রঙ্কো-নিমোনিয়ায় আক্রান্ত হন তিনি। ২৯ আগস্ট রবিবার সকালে কবির দেহের তাপমাত্রা আস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ১০৫ ডিগ্রি অতিক্রম করে যায়। কবিকে অক্সিজেন দেওয়া হয় এবং সাক্শান-এর সাহায্যে কবির ফুসফুস থেকে কফ ও কাশি বের করার চেষ্টা চলে। কিন্তু চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও কবির অবস্থার উন্নতি হয় না সব চেষ্টা হয় ব্যর্থ। ১২ই ভাদ্র ১৩৮৩ সাল মোতাবেক ২৯ আগস্ট ১৯৭৬ সকাল ১০টা ১০ মিনিটে কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বেতার এবং টেলিভিশনে কবির মৃত্যুসংবাদ প্রচারিত হলে পিজি হাসপাতালে নামে শোকাহত মানুষের ঢল। কবির মরদেহ প্রথমে পিজি হাসপাতালের গাড়ি বারান্দার ওপরে, পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় টিএসসি-র সামনে রাখা হয়। অবিরাম জন¯্রােত কবির মরদেহে জ্ঞাপন করেন ফুলেল শ্রদ্ধা।
নজরুল তাঁর একটি গানে লিখেছেন, “মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিয়ো ভাই/ যেন গোরের থেকে মুয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাই” কবির এই ইচ্ছার বিষয়টি বিবেচনা করে কবিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে সমাধিস্থ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় এবং সে অনুযায়ী রচিত হয় তাঁর সমাধি।
নজরুলের জানাজা:
কবির নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয় বাদ আসর সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানে। জানাজার নামাজে অংশ নেয় ১০ হাজারেরও অধিক মানুষ। নামাজে জানাজা শেষে শোভাযাত্রা সহযোগে কবির জাতীয় পতাকা শোভিত মরদেহ বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ প্রাঙ্গণে নিয়ে যাওয়া হয়। কবির মরদেহ বহন করেন তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, নৌবাহিনী প্রধান রিয়ার এডমিরাল এম. এইচ. খান, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল এ. জি. মাহমুদ, বিডিআর প্রধান মেজর জেনারেল দস্তগীর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ প্রাঙ্গণে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়। বাংলাদেশে তাঁর মৃত্যু উপলক্ষে পালিত হয় দুই দিনের রাষ্ট্রীয় শোক দিবস এবং ভারতের আইনসভায় কবির সম্মানে পালন করা হয় এক মিনিট নীরবতা।
কাজী নজরুলের অসুস্থতার ইতিহাস:
মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলাম আকস্মিকভাবে বাকরুদ্ধ হন ১৯৪২ সালের ১০ জুলাই। সওগাত সম্পাদক নাসির উদ্দীন তাঁর আত্মকথায় নজরুলের অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে বলেছেন, “নজরুলের শেষ লেখাটিও ছাপা হয়েছিল সওগাতেই। এ সময় একে ফজলুল হক ১৮৭৩-১৯৬২ খ্রিঃ একটা পত্রিকা বের করার সিদ্ধান্ত নেন। সম্পাদক হিসেবে সবাই নজরুলের নাম প্রস্তাব করেন। তিনি রাজিও হয়ে যান। কিন্তু এ সময় থেকেই শুরু হয়ে যায় তাঁর অসুস্থতা। ফজলুল হককে তাঁর শাশুড়ি জানালেন ‘জামাই’কে (নজরুল) তো, এখন আর বাইওে যেতে দেই না। কারণ রাতে ও ঘুমায় না। শুধু গুনগুন করে গান গায়। ভালো লক্ষণ মনে হচ্ছে না। আপনি যখন এসেছেন নিয়ে যান। হক সাহেবের ওখানে আর কাগজ চালাতে পারেননি নজরুল। এভাবেই উচ্ছ্বল নজরুল নীরব হয়ে যান। হয়ে যান সম্পূর্ণ বাকরুদ্ধ। এভাবেই সুদীর্ঘ ৩৪টি বছর ধরে (১৯৪২-১৯৭৬ খ্রিঃ) আয়ত নয়নে কবি শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকেছেন। কোনো কথা বলতে পারেননি। ফুলের জলসায় চিরকালের মতোই কবি একেবারে নীরব হয়ে গেলেন।”
কবি নজরুলের চিকিৎসার দায়িত্বে ছিলেন সেসময়ের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নিউরোসার্জন ড. অশোক বাগচী। ড. বাগচী অসুস্থ নজরুল সম্পর্কে বলেন, ‘‘নজরুলের অসুস্থতার লক্ষণ যখন প্রথম প্রকাশ পায় তখন বিষয়টিকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়া হয় নাই। বিশেষ করে তাঁর স্ত্রী প্রমিলা নজরুল যখন অসুস্থ হয়ে পড়েন, ১৯৩৯ খ্রিঃ। তারপর দেখা যায় নজরুল হঠাৎ ‘কালী সাধনা’ শুরু করেছেন। অনেকেই এটাকে ধওে নেন তাঁর ‘মানসিক বৈকল্য’ হিসাবে। গেরুয়া পোশাক আর মাথায় গেরুয়া টুপি ছিল তাঁর তখনকার পরিধেয় বস্ত্র। সেই সময় তিনি মাঝে মাঝে গ্রামোফোন কোম্পানিতে গান গাওয়ার সময় একটু-আধটু বেসুরো হতে থাকেন। অবশ্য ধরিয়ে দিলে ভুল বোঝেন এবং সংশোধনের চেষ্টাও করেন। কিন্তু পুরোপুরি অসুস্থ হবার পর ১৯৪২ খ্রিঃ তিনি সবকিছুর বাইরে চলে যান। কোনো কিছুই আর ঠিকমতো ধরে রাখতে পারেন না। এরূপ লক্ষণ তাঁর সে সময় প্রকাশ পায়।”
ড. বাগচী আরো বলেছেন, “বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম অসুস্থ ও বাকশক্তি রুদ্ধ হবার পর থেকে কোনো চশমাধারী লোককে কখনোই সহ্য করতে পারতেন না। চশমাধারী লোক তাঁর সামনে উপস্থিত হলে তৎক্ষণাৎ উত্তেজিত ও অস্বস্তি বোধ করতেন।” ড. অশোক বাগচীর ধারণা নিশ্চই কোনো চশমাধারী লোকই সে সময় তাঁর বড় ধরনের ক্ষতি করে দিয়েছিল যা তাঁর মস্তিষ্কের মধ্যে স্থায়ীভাবে দাগ কেটে দেয়।
নজরুলের মস্তিষ্কের প্রথম আধুনিক পরীক্ষা করানোর ব্যাপারে তাঁর উদ্যোগ ছিল সবচেয়ে বেশি। সেই ১৯৫৩ সালে ভিয়েনার যে বিশ্ববিখ্যাত চিকিৎসকবৃন্দ যৌথভাবে নজরুলের মস্তিষ্ক পরীক্ষা করেছিলেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন ভিয়েনার বিখ্যাত নিউরোলজিস্ট স্যার রাসেল ব্রেইন, নিউরো সার্জন ড. ওয়েলি ম্যাকিসক এবং বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী ড. উইলিয়াম সার্জেন্ট। ড. অশোক বাগচীও ছিলেন যৌথভাবে তাঁদের সঙ্গে। ওই পরীক্ষাতেই ধরা পড়ে নজরুলের ব্যাধি মানসিক বৈকল্য নয়। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৪২ সালের ১০ জুলাই নজরুল প্রথম বাকশক্তি হারান। এরপর থেকে তাঁর যত রকমের চিকিৎসা করা হয়েছে সব চিকিৎসাই ছিল ভুল ও ব্যর্থ। একমাত্র ডা. বিধান চন্দ্র আশঙ্কা করেছিলেন নজরুল ‘স্নায়ু বৈকল্যে‘ আক্রান্ত হয়েছেন, যার অনিবার্য পরিণতি আলঝেইমার্স ডিজিজ। কিন্তু নজরুলের জন্য সে সময় গঠিত মেডিক্যাল বোর্ড ডা. বিধান চন্দ্রের সুপারিশ কোনোক্রমেই গ্রহণ করেনি। ড. অশোক বাগচীর মতে ১৯৩৯ সালে নজরুলের মধ্যে যখন প্রাথমিকভাবে এই রোগের লক্ষণ ধরা পড়ে এবং সেই সময়ে যদি তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসার সুব্যবস্থা গ্রহণ করা হতো তবে নজরুলের সম্ভবত এই করুণ পরিণতি হতো না। ভিয়েনার ডাক্তাররা যৌথভাবে মত প্রকাশ করেন, নজরুলের চিকিৎসার আর সময় নেই। অনেক দেরি হয়ে গেছে।
বাংলাদেশ যেভাবে স্মরণে রেখেছে নজরুলকে:
কাজী নজরুল ইসলামকে মর্যাদা দেয়া হয়েছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জাতীয় কবির। তাঁর রচিত “চল্ চল্ চল্, ঊর্ধগগনে বাজে মাদল” বাংলাদেশের রণসংগীত হিসাবে গৃহীত। নজরুলের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী প্রতি বছর বিশেষভাবে উদযাপিত হয়। নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত ত্রিশালে (বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলায়) ২০০৫ সালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় নামক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় কবির স্মৃতিতে নজরুল একাডেমি, বুলবুল ললিতকলা একাডেমি ও শিশু সংগঠন বাংলাদেশ নজরুল সেনা স্থাপিত হয়। এছাড়া সরকারিভাবে স্থাপিত হয়েছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান নজরুল ইন্সটিটিউট। কাওরান বাজার ও বাংলা মটরের সামনে ঢাকা শহরের একটি প্রধান সড়কের নাম রাখা হয়েছে কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ।
তাঁর জীবদ্দশাতেই, বাংলা সাহিত্য এবং সংস্কৃতিতে তাঁর বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দের ৯ ডিসেম্বর তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডি.লিট উপাধিতে ভূষিত করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সমাবর্তনে তাঁকে এই উপাধি প্রদান করা হয়। ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ সরকার কবিকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করে। একই বছরের ২১ ফেব্রুয়ারিতে তাঁকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। একুশে পদক বাংলাদেশের সবচেয়ে সম্মানসূচক পদক হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে।

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *